মূল্যস্ফীতি থেকে ধনী-গরিব বৈষম্য

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে পাঁচ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বব্যাপী আলোচনার খোরাক হয়েছে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বব্যাপী আলোচনার খোরাক হয়েছে। হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করে প্রথম দিনে প্রতিশ্রুতিমতো কিছু আদেশে স্বাক্ষরও করেছেন। তবে যেকোনো প্রেসিডেন্টই ক্ষমতায় আরোহণের পর কিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন যা অনেক সময় তাকে নমনীয় হতে বাধ্য করে, বিষয়টি রিপাবলিকান ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও সত্য। তিনি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, আয়কর হ্রাস ও নতুন জ্বালানি খনি বিকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু সেই সব লক্ষ্য অর্জনে তাকে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

এপির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, স্থিতিশীল চাকরির বাজার ও বেকারত্ব সত্ত্বেও প্রেসিডেন্সির প্রথম বছরে ট্রাম্পের সামনে পাঁচটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকছে। এগুলো হলো মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি, বাণিজ্য উত্তেজনা, অভিবাসন সীমিত করার প্রভাব এবং সম্পদ অর্জনে বৈষম্য।

এখন ঘাড়ে চেপে বসা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের জন্য পূর্বসূরি জো বাইডেনকে দায়ী করতে পারেন সদ্য ক্ষমতায় বসা প্রেসিডেন্ট। মনে রাখতে হবে, ২০২১ সালে একইভাবে ট্রাম্পকে দোষারোপ করেছিলেন বাইডেন। গত বৃহস্পতিবার দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ট্রাম্প বলেই ফেললেন, আগের প্রশাসনের ব্যর্থ নীতির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার মোকাবেলা দিয়ে হোয়াইট হাউজে তার কাজ শুরু হয়েছে।

মহামারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মূল্যস্ফীতি। এপির এক জরিপে দেখা গেছে, নির্বাচনের সময় ১০ জনের মধ্যে চার ভোটার মূল্যস্ফীতিকে ভোটের সিদ্ধান্তে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে নির্বাচনে বিজয়ের জন্য অনেকাংশে গ্রোসারি পণ্য, জ্বালানি, আবাসন, গাড়ি ও অন্যান্য পণ্যের উচ্চ মূল্যের কাছে ঋণী ট্রাম্প।

সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে ভোক্তামূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ট্রাম্প যদি শুল্ক আরোপ করেন এবং বাজেট ঘাটতির মাঝে কর কমান, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরো খারাপ হতে পারে।

এর আগে ডিমের মূল্যবৃদ্ধির জন্য রিপাবলিকানরা বাইডেনকে দায়ী করত। এখন ডেমোক্র্যাটরা একইভাবে ট্রাম্পকে আক্রমণ করতে পারে। আবাসনের ক্ষেত্রে ভোটাররা এখনো উচ্চ বন্ধকি ঋণ ও বাড়ির মূল্য বৃদ্ধিতে বিরক্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, বেশি জ্বালানি উৎপাদনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি হ্রাস করতে চান তিনি। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এরই মধ্যে রেকর্ড স্তরে রয়েছে।

শুল্ককে অভিধানের সবচেয়ে পছন্দের শব্দ উল্লেখ করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। এছাড়া চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা রয়েছে।

২০১৭-২১ মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক বাড়িয়েছিলেন। এতে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ বার্ষিক ৮ হাজার ৫৪০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছিল, যা জিডিপির মাত্র দশমিক ৪ শতাংশ। ইয়েলের বাজেট ল্যাব ও পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসসহ একাধিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এ ধরনের শুল্ক মার্কিন সাধারণ পরিবারের ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

জাতীয় ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ। মূল্যস্ফীতির জন্য বাইডেন প্রশাসনের ঋণকে দায়ী করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে কমিটি ফর আ রেসপন্সিবল ফেডারেল বাজেটের (সিআরএফবি) তথ্য অনুযায়ী, ৩৬ লাখ কোটি ডলার জাতীয় ঋণের ২২ শতাংশই ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নীতিগুলোর ফলাফল।

ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা ও বর্তমানে ইকোনমিক পলিসি ইনোভেশন সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পল উইনফ্রি সম্প্রতি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। এখন ট্রাম্প যদি ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারেন, তাহলে তিনি ২০১৭ সালের করছাড় বজায় রাখতে সক্ষম হবেন এবং বছরে ১০ থেকে ১৪ হাজার কোটি ডলার ব্যয় কমিয়ে ঋণ যথেষ্ট স্থিতিশীল রাখতে পারবেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাহী আদেশে অভিবাসনকে জাতীয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ ও অপরাধের কারণ হিসেবে তুলে ধরলেও মার্কিন অর্থনীতিকে সচল রাখতে অভিবাসীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ৮৪ শতাংশের কারণ ছিল অভিবাসীরা, যা প্রায় ২৮ লাখ। অভিবাসীরা শুধু কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাদের ব্যয় অর্থনীতিকে সক্রিয় রাখে। বিশ্লেষক সত্যম পান্ডে বলেছেন, ট্রাম্প যদি অভিবাসন প্রবাহে ২০১৭-১৯ সালের গড় সাড়ে সাত লাখে ফিরে যান, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৭ থেকে কমে ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

ধনী ও শ্রমজীবী ভোটারদের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। তার অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা ইলোন মাস্ক, জেফ বেজোস, মার্ক জাকারবার্গ ও বেহনা আহনোঁর মতো শীর্ষ ধনীদের গড় সম্পদের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি ডলার বা আরো বেশি। গত বছর তাদের সম্পদ বেড়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ২০২১-২২ সালে একটি সাধারণ মার্কিন পরিবারের গড় সম্পদ মাত্র ৯ হাজার ৬০০ ডলার বেড়ে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ ডলার হয়েছে। ট্রাম্পের নীতিগুলো যদি ধনী ব্যক্তিদের আরো ধনী করে তোলে এবং সাধারণ ভোটারদের উপকারে না আসে, তবে এটি জনসমর্থনে প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও